বনলতা এক্সপ্রেস: শুরুতে ধীরগতির ট্রেন, শেষে আবেগের ঝড়

March 28, 2026

prothomupdate

বনলতা এক্সপ্রেস: শুরুতে ধীরগতির ট্রেন, শেষে আবেগের ঝড়

একটি সিনেমা শেষ হওয়ার পর যদি দর্শক নীরবে বসে থাকে, কিংবা চোখের কোণে জল নিয়ে দাঁড়িয়ে হাততালি দেয়—তাহলে সেই চলচ্চিত্রের সাফল্য নিয়ে আলাদা করে প্রশ্ন তোলার প্রয়োজন পড়ে না। কারণ তখন গল্পের ভালো-মন্দ নয়, বরং দর্শকের অনুভূতিই হয়ে ওঠে মূল বিচার। ঠিক এমনই এক আবেগময় অভিজ্ঞতা তৈরি করে “বনলতা এক্সপ্রেস”

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদের চলচ্চিত্র মানেই যেন অ্যাকশন, থ্রিলার আর উত্তেজনায় ভরপুর গল্প। পরিবার নিয়ে একসঙ্গে বসে দেখার মতো নির্মল গল্পের অভাব অনেকেই অনুভব করছিলেন। এই প্রেক্ষাপটে নির্মাতা তানিম নূর আবারও ভিন্নধারার গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন। তাঁর আগের কাজের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে “বনলতা এক্সপ্রেস”-এ তিনি তুলে ধরেছেন মানবিক সম্পর্ক, আবেগ আর জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তের গল্প—যা সহজেই পরিবারকেন্দ্রিক দর্শকদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ুন আহমেদের ‘কিছুক্ষণ’ অবলম্বনে নির্মিত এই সিনেমাটি দর্শকদের ফিরিয়ে নিয়ে যায় এক পরিচিত আবহে। গল্পের ভেতরে প্রবেশ করলেই যেন তাঁর লেখার সেই চিরচেনা আবেগ, হাসি-কান্না আর জীবনের সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণগুলো অনুভব করা যায়। পুরো গল্পজুড়ে এক ধরনের নস্টালজিয়া কাজ করে, যা দর্শকদের মনে আলাদা এক আবেশ তৈরি করে।

চলচ্চিত্রটির গল্পের কাঠামো একেবারেই স্বতন্ত্র। একটি ট্রেনযাত্রাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে নানা চরিত্রের আলাদা আলাদা জীবনকথা। প্রতিটি চরিত্র যেন নিজের মতো করে একটি গল্প বহন করে, আর সেই গল্পগুলো ধীরে ধীরে একসঙ্গে মিলিত হয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র তৈরি করে। শুরুতে গল্পের গতি কিছুটা ধীর মনে হতে পারে, কারণ নির্মাতা চরিত্রগুলোর সঙ্গে দর্শকের পরিচয় করিয়ে দিতে সময় নিয়েছেন। কিছু সংলাপ দীর্ঘ মনে হলেও, ইন্টারভালের পর গল্পে আসে গতি ও গভীরতা। তখন একে একে চরিত্রগুলোর আবেগ উন্মোচিত হতে থাকে, আর দর্শকও তাদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে।

অভিনয়ের দিক থেকে “বনলতা এক্সপ্রেস” বেশ শক্তিশালী। মোশাররফ করিম পুরো চলচ্চিত্রে কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থেকে অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। তাঁর সংলাপ উপস্থাপন, আবেগের প্রকাশ, এমনকি হালকা হাস্যরস সবকিছুই ছিল পরিমিত ও স্বাভাবিক। অনেক ক্ষেত্রে তিনি সহ-অভিনেতাদের অভিনয়কেও আরও উজ্জ্বল করে তুলেছেন, যা তাঁর অভিজ্ঞতারই প্রমাণ।

শরিফুল রাজ নিজের চরিত্রে ভালো করলেও, পর্দায় অন্যদের উপস্থিতি অনেক সময় তাকে ছাপিয়ে গেছে। চঞ্চল চৌধুরী স্বাভাবিক অভিনয়ের মাধ্যমে নিজের জায়গা ধরে রেখেছেন, যদিও কিছু দৃশ্যে নৈতিক বার্তা দেওয়ার প্রবণতা একটু বেশি চোখে পড়ে। জাকিয়া বারী মম আবেগঘন দৃশ্যগুলোতে ভালো করেছেন। সাবিলা নূর, শ্যামল মাওলা এবং শিশুশিল্পীর অভিনয়ও প্রশংসার দাবি রাখে। বিশেষ করে ছোট্ট চরিত্রটি দর্শকদের মন ছুঁয়ে যায় সহজেই।

চলচ্চিত্রটির আরেকটি বড় শক্তি এর সংগীত। অর্থহীন ব্যান্ডের গান থেকে শুরু করে প্রয়াত আইয়ুব বাচ্চুর সুর সবকিছুই দর্শকদের মধ্যে নস্টালজিক অনুভূতি জাগিয়ে তোলে। অর্ণবের কণ্ঠও সিনেমাটির আবহকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর পুরো গল্পের সঙ্গে সুন্দরভাবে মিশে গিয়ে আবেগকে আরও গভীর করে তোলে।

পুরো সিনেমার বেশিরভাগ অংশ একটি ট্রেনের ভেতরে সীমাবদ্ধ থাকলেও কোথাও একঘেয়েমি আসে না। বরং এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেই পরিচালক গল্পকে জীবন্ত করে তুলেছেন, যা তাঁর নির্মাণ দক্ষতার প্রমাণ।

সব মিলিয়ে, “বনলতা এক্সপ্রেস” শুরুতে ধীরগতির হলেও শেষের দিকে এক আবেগঘন যাত্রায় পরিণত হয়। সিনেমাটি শেষ হওয়ার পর মনে থেকে যায় এক ধরনের শান্ত, তৃপ্তির অনুভূতি। যারা পরিবার নিয়ে বসে হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া একটি গল্প দেখতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে এক অনন্য অভিজ্ঞতা।

সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Comment