চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলার পূর্ব আলিখিল এলাকায় গভীর রাতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হয়েছেন প্রবাসফেরত যুবক কাউসারুজ্জামান (৩৬)। শুক্রবার দিবাগত রাতের এই মর্মান্তিক ঘটনাটি এলাকায় চরম আতঙ্ক ও শোকের সৃষ্টি করেছে। পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান নেওয়ায় পরিকল্পিতভাবেই তাকে হত্যা করা হয়েছে।
জানা গেছে, রাত প্রায় তিনটার দিকে কাউসারুজ্জামান তাঁর মামাতো ভাই আশরাফুর রহমানকে সঙ্গে নিয়ে নানাবাড়ি থেকে নিজ বাড়ির পথে ফিরছিলেন। বাড়ি থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার দূরে এবং নানাবাড়ি থেকে প্রায় ২০০ মিটার এগোতেই হঠাৎ ১০ থেকে ১২ জন অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত তাদের পথরোধ করে। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে তারা দ্রুত সেখান থেকে পালানোর চেষ্টা করেন। কিছু দূর দৌড়ে যাওয়ার পর সন্ত্রাসীদের একজন পেছন থেকে কাউসারুজ্জামানকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। গুলিবিদ্ধ হয়ে তিনি ঘটনাস্থলেই লুটিয়ে পড়েন।
গুলির শব্দ শুনে আশপাশের লোকজন বেরিয়ে এলে সন্ত্রাসীরা দ্রুত পালিয়ে যায়। গুরুতর আহত অবস্থায় স্বজনরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা ভোরের দিকে তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এই ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই থেকে দেশে ফেরেন কাউসারুজ্জামান। তিনি দুই কন্যা সন্তানের জনক। দেশে ফিরে তিনি কৃষিকাজে যুক্ত হন এবং একই সঙ্গে এলাকায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বিভিন্ন অপরাধমূলক তথ্য সরবরাহ করতেন, যা সন্ত্রাসীদের মধ্যে ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
নিহতের বাবা আবুল কালাম জানান, কয়েকদিন আগে এলাকার একটি ছিনতাইয়ের ঘটনা কাউসারুজ্জামান নিজের মোবাইল ফোনে ধারণ করেছিলেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে দুর্বৃত্তরা তাকে হুমকি দেয়। এছাড়া এলাকায় মাটি কাটাকে কেন্দ্র করে কিছু ব্যক্তির সঙ্গে তার বিরোধ চলছিল বলেও জানা গেছে। এসব ঘটনার সঙ্গে হত্যাকাণ্ডের যোগ থাকতে পারে বলে ধারণা পরিবারের।
ঘটনার পরদিন নিহতের পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। বাড়িতে এখনো স্বজনদের আহাজারি চলছে। এদিকে হত্যার প্রতিবাদে এলাকাবাসী বিক্ষোভ করে এবং একপর্যায়ে সড়ক অবরোধ করে।
পুলিশ জানিয়েছে, এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নিহতের বাবা বাদী হয়ে ১২ জনের নাম উল্লেখ করে একটি মামলা দায়ের করেছেন। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের মধ্যে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা হলেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. শফি (৩৯) ও মো. সুমন (৩৩)। বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
রাউজান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাজেদুল ইসলাম জানান, প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে তথ্য দেওয়ার কারণেই কাউসারুজ্জামানকে টার্গেট করা হয়। গ্রেপ্তার আসামিদের রিমান্ডে নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে এবং অন্যদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
উল্লেখ্য, গত প্রায় দেড় বছরে রাউজান এলাকায় একাধিক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি ও বালু মাটি ব্যবসাকে কেন্দ্র করে এসব সহিংসতার ঘটনা ঘটছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সন্ত্রাসীদের দমন করা না গেলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যেতে পারে।
সোর্স: প্রথম আলো


