ভারতের সাম্প্রতিক আঞ্চলিক নির্বাচনের আবহে পশ্চিমবঙ্গকে ঘিরে উত্তেজনা সবচেয়ে বেশি। চারটি রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোট অনুষ্ঠিত হলেও জনসংখ্যা ও রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকে পশ্চিমবঙ্গ আলাদা করে নজর কাড়ছে। এপ্রিলজুড়ে ধাপে ধাপে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর ৪ মে ঘোষিত হবে বহুল প্রতীক্ষিত ফলাফল। আর এই ফলাফল ঘিরেই এখন রাজ্যজুড়ে একটাই আলোচনা ক্ষমতা কি আবারও থাকবে তৃণমূল কংগ্রেসের হাতে, নাকি কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন বিজেপি দখল করবে কলকাতার মসনদ?
এবারের নির্বাচনে মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় টানা চতুর্থবারের মতো ক্ষমতায় ফেরার লক্ষ্যে লড়ছেন। অন্যদিকে বিজেপির পক্ষে রাজ্যে শক্তিশালী নেতৃত্ব দিচ্ছেন শুভেন্দু অধিকারী, যিনি একসময় তৃণমূল কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় এবার তৃণমূল বেশ অভিনব পন্থা নিয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ‘দিদি বনাম মোদি’ থিমে সাপলুডুর বোর্ড বিতরণ করা হয়েছে, যেখানে প্রতীকীভাবে বড় সাপের মুখে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ছবি বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে ভোটারদের কাছে একটি রাজনৈতিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে ভুল পছন্দ করলে “সাপের মুখে পড়ার” মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তবে এবারের নির্বাচনকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে বিজেপির ক্রমবর্ধমান শক্তি। ২০১৬ সালের নির্বাচনে মাত্র ৩টি আসন পাওয়া দলটি ২০২১ সালে ৭৭টি আসন জিতে বড় ধরনের উত্থান ঘটায়। এই প্রবৃদ্ধি শুধু পশ্চিমবঙ্গেই নয়, বরং সারা ভারতে বিজেপির বিস্তৃত রাজনৈতিক প্রভাবের প্রতিফলন হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ফলে তৃণমূলের জন্য এবারের লড়াই আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনে একাধিক বিষয় বড় ভূমিকা রাখবে। বাঙালি পরিচয়, ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নটি ভোটারদের আবেগের কেন্দ্রে রয়েছে। অনেকের আশঙ্কা, বিজেপি ক্ষমতায় এলে পশ্চিমবঙ্গের নিজস্ব সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই রাজ্য বিশ্বকে উপহার দিয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, অমর্ত্য সেন ও অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো নোবেলজয়ী ব্যক্তিত্ব যা বাঙালির গর্বের অন্যতম ভিত্তি।
ভাষা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে ভোটারদের মধ্যে। অনেকে মনে করছেন, বিজেপি ক্ষমতায় এলে হিন্দি ভাষার প্রভাব বাড়তে পারে, যা বাংলা ভাষার অবস্থানকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে। একইসঙ্গে খাদ্যাভ্যাস নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। “মাছে-ভাতে বাঙালি” পরিচয়ের সঙ্গে নিরামিষভিত্তিক সংস্কৃতির সম্ভাব্য চাপ নিয়ে আলোচনা চলছে। এসব উদ্বেগ কমাতে বিজেপির কিছু প্রার্থীকে স্থানীয় সংস্কৃতির সঙ্গে মানিয়ে প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।
এদিকে মুসলিম ভোটাররা এবারের নির্বাচনে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন। রাজ্যের প্রায় ১৫ শতাংশ জনগোষ্ঠী মুসলিম, এবং এই ভোটব্যাংক ঐতিহ্যগতভাবে তৃণমূলের পক্ষে রয়েছে। তবে নির্বাচন সামনে রেখে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার অভিযোগ নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার মতো মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায় এ অভিযোগ বেশি উঠেছে, যা বিরোধী পক্ষের তীব্র সমালোচনার কারণ হয়েছে।
তৃণমূল নেতাদের দাবি, দরিদ্র ও কম শিক্ষিত মানুষদের বিভ্রান্ত করে অনেকের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, এবং এতে মুসলিমদের সংখ্যাই বেশি। অন্যদিকে বিজেপি এসব অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাচন প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ বলে দাবি করছে।
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন এখন কেবল একটি রাজ্য সরকারের লড়াই নয়; এটি হয়ে উঠেছে জাতীয় রাজনীতির এক বড় পরীক্ষা। সাংস্কৃতিক পরিচয়, ধর্মীয় সমীকরণ, অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং রাজনৈতিক কৌশলের এই জটিল সমীকরণে শেষ পর্যন্ত কে জিতবে দিদি না মোদি সেই উত্তরই জানার অপেক্ষায় রয়েছে পুরো ভারত।
সোর্স: প্রথম আলো


