মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘদিনের টানাপোড়েন নতুন করে আলোচনায় এসেছে। সাম্প্রতিক এক বিশ্লেষণে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার বাঘের গালিবাফ স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের তুলনায় তেহরানের হাতে এখনো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ‘কার্ড’ রয়েছে, যা প্রয়োজনে ব্যবহার করা যেতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই তার অনেক শক্তি প্রয়োগ করেছে, কিন্তু ইরান এখনো তার সম্পূর্ণ সক্ষমতা প্রদর্শন করেনি।
রোববার রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে গালিবাফ একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, এই প্রতিযোগিতাকে বোঝার জন্য একটি ‘সমীকরণ’ কল্পনা করা যেতে পারে। যেখানে একদিকে রয়েছে ইরানের সরবরাহনির্ভর শক্তি, আর অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের চাহিদানির্ভর কৌশল।
ইরানের শক্তির উৎস হিসেবে তিনি তিনটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান তুলে ধরেন হরমুজ প্রণালি, বাব এল-মান্দেব প্রণালি এবং তেলের পাইপলাইন নেটওয়ার্ক। এই রুটগুলো বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তেল পরিবাহিত হয়, যা আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানের প্রভাবকে দৃঢ় করে।
গালিবাফ দাবি করেন, এই ‘কার্ড’গুলোর মধ্যে কিছু আংশিকভাবে ব্যবহৃত হলেও অনেকগুলো এখনো অব্যবহৃত রয়ে গেছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালির ওপর ইরান সীমিত প্রভাব প্রয়োগ করেছে, তবে বাব এল মান্দেব প্রণালি কিংবা পাইপলাইন ব্যবস্থার পূর্ণ ব্যবহার এখনো করা হয়নি। অর্থাৎ, তেহরানের হাতে এখনো বিকল্প পথ খোলা রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, ওয়াশিংটন মূলত চাহিদা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত মজুত থেকে তেল বাজারে ছাড়া, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মূল্য সমন্বয় করা। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে এই পদক্ষেপগুলোর বেশ কিছু বাস্তবায়ন করেছে, যা তাদের বিকল্প সীমিত করে দিয়েছে।
গালিবাফ আরও উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও এই প্রতিযোগিতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন সময়ে দেশটিতে জ্বালানির চাহিদা বেড়ে যায়, যা তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে। ফলে, এই সময়ে বাজার নিয়ন্ত্রণ করা তাদের জন্য আরও কঠিন হয়ে ওঠে।
এদিকে কূটনৈতিক অঙ্গনেও উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি অভিযোগ করেছেন, তেহরান-ওয়াশিংটন আলোচনার অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তা সফল হয়নি যুক্তরাষ্ট্রের অনমনীয় অবস্থানের কারণে। তার দাবি, অতিরিক্ত শর্ত আরোপ ও কঠোর অবস্থানের ফলে আলোচনার কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যায়নি।
সোমবার রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছে আরাগচি এই মন্তব্য করেন। সেখানে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে তার বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে, যা ভবিষ্যৎ কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন দিক নির্দেশ করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সার্বিকভাবে, গালিবাফের বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে ইরান নিজেদের কৌশলগত অবস্থানকে এখনো শক্তিশালী হিসেবে দেখছে এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলো অনেকাংশেই ইতোমধ্যে ব্যবহৃত হওয়ায় তাদের কৌশলগত পরিসর কিছুটা সীমিত হয়ে পড়েছে বলে ইরানের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে। এই পরিস্থিতি ভবিষ্যতে দুই দেশের সম্পর্ক ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
সোর্স: প্রথম আলো


