রূপপুরে জ্বালানি লোডিংয়ের ঐতিহাসিক যাত্রা

April 28, 2026

prothomupdate

রূপপুরে জ্বালানি লোডিংয়ের ঐতিহাসিক যাত্রা

বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা হলো পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি প্রবেশের এই প্রক্রিয়াকে ‘ফিজিক্যাল স্টার্টআপ’ বলা হয়, যা একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পথে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। মঙ্গলবার দুপুরে এক আনুষ্ঠানিক আয়োজনের মাধ্যমে এই কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হয়, যা দেশের ইতিহাসে এক অনন্য মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে রূপপুর প্রকল্প এলাকায় আয়োজন করা হয় এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের। এতে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংস্থার প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। তাঁর সঙ্গে যৌথভাবে উদ্বোধনী বাটন চাপেন রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক শক্তি সংস্থা রোসাটম-এর মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভ। এছাড়াও আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) প্রতিনিধিসহ রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা এই ঐতিহাসিক মুহূর্তের সাক্ষী হন।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী বলেন, এই দিনটি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণের প্রতীক। তাঁর মতে, রূপপুর প্রকল্প কেবল একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র নয়, বরং এটি দেশের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, দক্ষতা এবং আত্মনির্ভরতার প্রতিচ্ছবি। তিনি আরও উল্লেখ করেন, এই প্রকল্প চালু হলে জাতীয় গ্রিডে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ যুক্ত হবে, যা দেশের শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করবে। একই সঙ্গে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

অন্যদিকে, রোসাটম-এর প্রধান আলেক্সি লিখাচেভ তাঁর বক্তব্যে বলেন, রূপপুর প্রকল্পের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু হওয়া মানেই কেন্দ্রটি এখন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। তিনি জানান, আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে নির্মিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের আয়ুষ্কাল প্রায় ১০০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। ফলে এটি দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশকে পরিবেশবান্ধব ও স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। তিনি আরও জানান, প্রকল্পের দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে এবং আগামী বছর সেখানেও জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়েছে রাশিয়ার অত্যাধুনিক ‘ভিভিইআর-১২০০’ প্রযুক্তি, যা জেনারেশন থ্রি প্লাস শ্রেণির একটি নিরাপদ ও উন্নত পারমাণবিক রিয়্যাক্টর। এই প্রযুক্তি বিশ্বব্যাপী নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার জন্য সুপরিচিত। কেন্দ্রটির দুটি ইউনিট চালু হলে মোট ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে, যা দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বড় অবদান রাখবে।

নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রসঙ্গে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার নির্ধারিত কঠোর মানদণ্ড অনুসরণ করে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হচ্ছে। পাশাপাশি দেশীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে। আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি এবং বহুমাত্রিক সুরক্ষা ব্যবস্থা এই প্রকল্পকে বিশ্বমানের নিরাপত্তা প্রদান করছে।

সব মিলিয়ে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং কার্যক্রমের সূচনা বাংলাদেশের জ্বালানি খাতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেনি, বরং দেশকে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এই প্রকল্প দেশের টেকসই উন্নয়ন ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন

Leave a Comment