‘জঙ্গি আছে’, ‘তৎপরতা নেই’—সরকারি বক্তব্যে দ্বৈত সুর

April 28, 2026

prothomupdate

জঙ্গি আছে’, ‘তৎপরতা নেই’—সরকারি বক্তব্যে দ্বৈত সুর

দেশে জঙ্গিবাদের অস্তিত্ব ও সক্রিয়তা নিয়ে সরকারের দুই গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ভিন্নধর্মী বক্তব্য নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একই দিনে দেওয়া দুই বক্তব্যে উঠে এসেছে দুটি আলাদা চিত্র একদিকে বলা হচ্ছে দেশে জঙ্গি রয়েছে, অন্যদিকে দাবি করা হচ্ছে বর্তমানে কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই।

মঙ্গলবার সকালে সচিবালয়ে এক ব্রিফিংয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, দেশে জঙ্গি সংগঠনের অস্তিত্ব এখনো রয়েছে। তবে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়বে। তিনি ব্যাখ্যা করেন, অতীতে জঙ্গিবাদ ইস্যুটি কখনো কখনো অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, আবার কোনো কোনো সময় এটিকে পুরোপুরি অস্বীকার করার প্রবণতাও দেখা গেছে যা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিকে বাস্তবসম্মতভাবে মূল্যায়ন করাই জরুরি।

একই দিনে দুপুরে কোস্ট গার্ডের ৩১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, দেশে এখন কোনো জঙ্গি তৎপরতা নেই। তিনি দাবি করেন, অতীতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ‘জঙ্গিবাদ’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, কিছু উগ্রপন্থী বা কট্টরপন্থী গোষ্ঠী সমাজে থাকতে পারে, যা বিশ্বের প্রায় সব দেশেই দেখা যায়।

এই দুই ভিন্ন বক্তব্যের মধ্যেই উঠে এসেছে নিরাপত্তা পরিস্থিতির একটি জটিল বাস্তবতা। একটি গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যানুসারে, দেশের তালিকাভুক্ত ১৬১১ জন জঙ্গির মধ্যে অনেকেই আবার সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। তাদের একটি বড় অংশ জামিনে মুক্ত হয়ে পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে বলে জানা গেছে। এদের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ১২৩১ জন জঙ্গি কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছে। এর পাশাপাশি ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত আরও ৩৮০ জন মুক্ত হয়েছে। এসব মুক্তিপ্রাপ্তদের মধ্যে বিভিন্ন সংগঠনের সদস্য রয়েছে, যারা পূর্বে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, জামিন পাওয়ার পর অনেকেই আদালতে হাজিরা দিচ্ছে না কিংবা তাদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত কোনো তথ্য নেই।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, অন্তত ১১৪ জন দীর্ঘদিন ধরে আদালতে অনুপস্থিত এবং আরও ৯৬ জনের অবস্থান অজানা। একই সঙ্গে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে অভিযুক্ত অন্তত ৩৭০ জন এখনো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে। এ অবস্থায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পলাতক ও সক্রিয় সন্দেহভাজনদের ধরতে অভিযান জোরদার করেছে।

র‍্যাবের পক্ষ থেকেও জানানো হয়েছে, সন্ত্রাসবিরোধী মামলায় অভিযুক্ত পলাতক ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারে নিয়মিত অভিযান পরিচালিত হচ্ছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।

এদিকে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিবেচনায় দেশের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে আটটি বিমানবন্দরসহ মোট ১২টি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় জোরদার সতর্কতা জারি করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুতি জোরদার রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে কারাগারগুলোতেও এখনো উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি বন্দি রয়েছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৬টি কারাগারে ১৬২ জন জঙ্গি বন্দি আছেন। এদের মধ্যে কেউ বিচারাধীন, কেউ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত, আবার কেউ যাবজ্জীবন সাজা ভোগ করছেন।

সব মিলিয়ে, দেশে জঙ্গিবাদ ইস্যুতে সরকারি বক্তব্যে পার্থক্য থাকলেও নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি মূল্যায়নে সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।

সোর্স: কালেরকণ্ঠ

Leave a Comment