কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলায় গভীর রাতে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বাস-ট্রেন সংঘর্ষে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ দুর্ঘটনার ফলে চট্টগ্রামের সঙ্গে সারাদেশের রেল যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা ভোরের পর থেকেই যাত্রীদের ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শনিবার (২১ মার্চ) দিবাগত রাত প্রায় ৩টার দিকে উপজেলার পদুয়ার বাজার এলাকার একটি রেলক্রসিংয়ে এই দুর্ঘটনা ঘটে। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী একটি দ্রুতগামী ট্রেনের সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামগামী ‘মামুন স্পেশাল’ নামের একটি যাত্রীবাহী বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে ট্রেনটি বাসটিকে ধাক্কা দেওয়ার পর প্রায় এক কিলোমিটার পর্যন্ত টেনে নিয়ে যায়।
দুর্ঘটনার পরপরই এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ও শোকের ছায়া নেমে আসে। খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু করেন। তারা বাসের ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের বের করে আনেন এবং নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। একই সঙ্গে আহতদেরও দ্রুত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী এবং ট্রেনের যাত্রীরা অভিযোগ করেছেন, রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বে থাকা সিগন্যালম্যানের অবহেলার কারণেই এই দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাদের দাবি, সঠিক সময়ে সতর্ক সংকেত না দেওয়ায় বাসটি রেললাইনে উঠে পড়ে এবং তখনই ট্রেন এসে ধাক্কা দেয়। এছাড়া, দুর্ঘটনার সময় জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ একাধিকবার ফোন করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এ বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপসহকারী পরিচালক মো. ইদ্রিস প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে জানান, রেলক্রসিংয়ে পর্যাপ্ত সিগন্যালিং ব্যবস্থা না থাকায় বাসচালক পরিস্থিতি বুঝতে পারেননি। ফলে বাসটি রেললাইনে উঠে গেলে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কুমিল্লা ইপিজেড পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ পরিদর্শক মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার কার্যক্রমে অংশ নেয়। তিনি জানান, নিহতদের পরিচয় শনাক্তের কাজ চলছে এবং দুর্ঘটনার সঠিক কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত শুরু হয়েছে।
এদিকে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক ডা. অজয় ভৌমিক জানান, এখন পর্যন্ত ১২ জনের মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে মাত্র দুজনের পরিচয় নিশ্চিত করা গেছে, বাকিদের পরিচয় শনাক্তে কাজ চলছে। আহতদের চিকিৎসা দিতে হাসপাতালের চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
ঘটনার পর সকালে রেলওয়ে ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে দ্রুত রেল যোগাযোগ স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেন এবং ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা এড়াতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আবারও দেশের রেলক্রসিংগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনে দিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঝুঁকিপূর্ণ ক্রসিংয়ে আধুনিক সিগন্যালিং ব্যবস্থা ও কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করা না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে পারে।


