দেশে দীর্ঘ আট বছর ধরে হামের টিকাদান কার্যক্রম বন্ধ থাকার তথ্য প্রকাশ করে গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল। তিনি জানান, এ দীর্ঘ বিরতির কারণে দেশে হামের সংক্রমণ আবারও আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ইতোমধ্যে নতুন করে টিকা সংগ্রহের উদ্যোগ নিয়েছে এবং এ খাতে ৬০৪ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
রোববার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ওষুধশিল্প মেলার উদ্বোধন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব তথ্য জানান। মন্ত্রী বলেন, “দেশে হামের রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে। সর্বশেষ আট বছর আগে এই টিকার কার্যক্রম চালু ছিল, এরপর আর তা অব্যাহত রাখা হয়নি। ফলে বর্তমানে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।”
তিনি আরও জানান, টিকা সংগ্রহের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। পারচেজ কমিটির অনুমোদন পাওয়া গেছে এবং খুব শিগগিরই টিকা দেশে আনা হবে। এরপর দ্রুত সময়ের মধ্যে সারাদেশে টিকাদান কার্যক্রম পুনরায় শুরু করা হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়ম অনুযায়ী, শিশুদের ৯ মাস বয়সে হামের প্রথম ডোজ এবং ১৫ মাস বয়সে দ্বিতীয় ডোজ দেওয়া বাধ্যতামূলক। পাশাপাশি বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে ৯ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদেরও এই টিকার আওতায় আনা হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন এই কর্মসূচি স্থগিত থাকায় অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে গেছে, যা বর্তমান সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চলতি বছরের শুরুতেই পরিস্থিতি জটিল আকার ধারণ করে। জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবিরে হামের রোগী শনাক্ত হওয়ার পরপরই সতর্কতা জারি করা হয়। এরপর ধীরে ধীরে রাজধানীর ঘনবসতিপূর্ণ বস্তি এলাকাগুলোতেও রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করে।
রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে গিয়ে দেখা গেছে, শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি। সেখানে ভর্তি হওয়া রোগীদের বড় অংশই হামে আক্রান্ত শিশু। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তাদের যথেষ্ট চাপের মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে।
এ অবস্থায় সরকারের প্রস্তুতি সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, সংক্রমণ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) বিভিন্ন ওয়ার্ডকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এছাড়া সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল, শিশু হাসপাতাল এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ ও ভেন্টিলেটর সুবিধা নিশ্চিত করা হয়েছে। ঢাকার বাইরে মানিকগঞ্জসহ বিভিন্ন জেলাতেও প্রস্তুতি জোরদার করা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আইসিইউ সংকটের কারণে কয়েকজন শিশুর মৃত্যুর ঘটনা সরকারকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। এই প্রেক্ষাপটে নতুন ভেন্টিলেটর সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী। ইতোমধ্যে পাঁচটি ভেন্টিলেটর সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মধ্যে চারটি রাজশাহীতে পাঠানো হবে।
তিনি আরও বলেন, দেশীয় ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত আরও অন্তত ১২টি ভেন্টিলেটর সরবরাহ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব সরঞ্জাম স্বাস্থ্যখাতকে শক্তিশালী করবে এবং হামের মতো সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
সব মিলিয়ে, দীর্ঘদিন টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকার ফলে যে ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা থেকে উত্তরণে দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সোর্স: মানবজমিন


