নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি র গ্রেফতারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে। শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে পুলিশ তাকে তার নিজ বাসভবন থেকে আটক করে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে সংঘটিত জেন-জি নেতৃত্বাধীন বিক্ষোভে প্রাণহানির ঘটনায় তার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম The Guardian-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই গ্রেফতার শুধুমাত্র একটি ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক ঘটনা নয়, বরং এটি নেপালের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতারই বহিঃপ্রকাশ। গত বছরের ৮ ও ৯ সেপ্টেম্বর দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া আন্দোলনে অন্তত ৭৭ জন নিহত হন, যাদের অধিকাংশই তরুণ। এই আন্দোলনটি মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারের আরোপিত সীমাবদ্ধতার প্রতিবাদ হিসেবে শুরু হলেও, এর পেছনে দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক হতাশা, বেকারত্ব এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে ক্ষোভ বড় ভূমিকা রেখেছিল।
প্রথম দিনেই বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের ফলে অন্তত ১৯ জন তরুণ নিহত হন। এরপর পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে ওঠে। দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, এমনকি সংসদ ভবন ও সরকারি স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটে। এই সহিংসতা শেষ পর্যন্ত সরকার পতনের পথ প্রশস্ত করে।
ওলির দল কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল) এর জ্যেষ্ঠ নেতা মিন বাহাদুর শাহি জানান, “আজ সকালে পুলিশ এসে তাকে বাসা থেকে নিয়ে গেছে।” পুলিশের পক্ষ থেকেও বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মুখপাত্র ওম অধিকারী বলেন, শুধু ওলি নন, তার সময়কার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে।
এদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনে বড় পরিবর্তন এসেছে। জনপ্রিয় র্যাপার থেকে রাজনীতিবিদ হয়ে ওঠা বালেন্দ্র শাহ সম্প্রতি অনুষ্ঠিত সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত নির্বাচনের ফলাফলের ভিত্তিতে শুক্রবার তিনি শপথ নেন। ওলির সরকারের পতনের পর এটিই ছিল প্রথম জাতীয় নির্বাচন, যা দেশের রাজনৈতিক গতিপথে নতুন দিক নির্দেশ করছে।
নতুন সরকার গঠনের মাত্র একদিন পরই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর গ্রেফতার হওয়া অনেকের কাছেই তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এটি একদিকে যেমন বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ, অন্যদিকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার কৌশল হিসেবেও দেখা হতে পারে।
তবে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ঘটনাকে ঘিরে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, এতদিন পর হলেও আন্দোলনে নিহতদের জন্য বিচার প্রক্রিয়া শুরু হওয়া ইতিবাচক। আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, এতে রাজনৈতিক প্রতিশোধের রাজনীতি আরও উসকে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে, কেপি শর্মা ওলির গ্রেফতার শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ নয়, বরং এটি নেপালের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে। এখন দেখার বিষয়, তদন্ত প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত হয় এবং এটি দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় কী প্রভাব ফেলে।
সোর্স: বাংলাদেশ প্রতিদিন


