মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে নতুন করে উদ্বেগ ছড়িয়েছে বৈশ্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে। সাম্প্রতিক সময়ে এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত থাকলে লোহিত সাগরের তলদেশ দিয়ে বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবস্থা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। যদিও এই বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো স্পষ্ট ঘোষণা বা নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি, তবুও কৌশলগত বিশ্লেষকরা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছেন।
বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট যোগাযোগের একটি বড় অংশ নির্ভর করে সমুদ্রের নিচ দিয়ে স্থাপিত ফাইবার অপটিক কেবলগুলোর উপর। বিশেষ করে লোহিত সাগরের তলদেশে বিস্তৃত এই কেবল নেটওয়ার্কটি এশিয়া, ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে। ধারণা করা হয়, এই পথ দিয়ে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের প্রায় ৩০ শতাংশ আদান-প্রদান হয়। ফলে এই অবকাঠামোতে কোনো ধরনের বিঘ্ন ঘটলে তা শুধু আঞ্চলিক নয়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
আধুনিক বিশ্বের প্রায় প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল কার্যক্রম—যেমন অনলাইন ব্যাংকিং, আন্তর্জাতিক লেনদেন, ক্লাউড কম্পিউটিং, ভিডিও কনফারেন্সিং, ইমেইল যোগাযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর সেবা—এসব কেবল নেটওয়ার্কের উপর নির্ভরশীল। তাই এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে এর প্রভাব পড়বে প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার উপর।
এদিকে, সাবমেরিন কেবল স্থাপন ও রক্ষণাবেক্ষণে জড়িত প্রতিষ্ঠানগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। ফ্রান্সভিত্তিক প্রতিষ্ঠান আলকাটেল সাবমেরিন নেটওয়ার্কস তাদের গ্রাহকদের ‘ফোর্স ম্যাজিউর’ সতর্কতা জারি করেছে। এর অর্থ হলো, নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা কোনো পরিস্থিতির কারণে তাদের সেবা ব্যাহত হতে পারে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির একটি গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ বর্তমানে সৌদি আরবের দাম্মাম উপকূলে আটকে রয়েছে, যা চলমান অনিশ্চয়তারই একটি ইঙ্গিত বহন করে।
শুধু তাই নয়, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর মধ্যেও ইতোমধ্যে সতর্কতা দেখা যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জায়ান্ট মেটা এই মাসের শুরুতেই সমুদ্রতলীয় কেবল সংক্রান্ত কিছু কার্যক্রম স্থগিত করেছে বলে জানা গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, পরিস্থিতির সম্ভাব্য ঝুঁকি তারা আগেভাগেই বিবেচনায় নিচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রযুক্তি উদ্যোক্তা মারিও নাওফাল সামাজিক মাধ্যমে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ কেবলগুলো বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ট্র্যাফিকের একটি বড় অংশ বহন করে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবে স্থাপিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডেটা সেন্টারগুলো এই কেবলগুলোর উপর নির্ভরশীল। এসব সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে স্বল্প সময়ের জন্য নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক ইন্টারনেট সেবা ব্যাহত হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবমেরিন কেবল কেটে দেওয়া প্রযুক্তিগতভাবে সম্ভব হলেও তা সহজ নয় এবং এর পরিণতি অত্যন্ত জটিল হতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ফলে কূটনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিতে অস্থিরতা দেখা দিতে পারে।
সব মিলিয়ে, লোহিত সাগরের তলদেশে থাকা ইন্টারনেট অবকাঠামোকে ঘিরে যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি অঞ্চলের নয়, বরং পুরো বিশ্বের জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বে যেখানে সবকিছুই ক্রমবর্ধমানভাবে ডিজিটাল নির্ভর হয়ে উঠছে, সেখানে এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও নিরাপত্তা জোরদার করা এখন সময়ের দাবি।
সোর্স: দৈনিক সংগ্রাম।


