ফুটবল বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় খেলা, আর বড় ম্যাচ মানেই দর্শকদের তুমুল উচ্ছ্বাস। কিন্তু সেই উচ্ছ্বাস কখনো কখনো সীমা ছাড়িয়ে যায়। টিকিট না পেয়েও অনেকেই কৌশলে স্টেডিয়ামে প্রবেশের চেষ্টা করেন—যা বহুদিন ধরেই বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে। এবার এমনই এক ঘটনায় নজিরবিহীন কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে ইংল্যান্ডের একটি আদালত, যা ফুটবলভক্তদের মধ্যে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, ‘টেইলগেটিং’ নামে পরিচিত এই অবৈধ প্রবেশের দায়ে প্রথমবারের মতো একজন দর্শককে দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। শুধু মাঠে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাই নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক জরিমানাও। ফলে বিষয়টি এখন আর সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখা হচ্ছে না; বরং জননিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত গুরুতর ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
ঘটনার সূত্রপাত গত ২২ মার্চ, লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত লিগ কাপের ফাইনাল ম্যাচে। সে ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল ইংল্যান্ডের দুই শক্তিশালী ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটি ও আর্সেনাল। স্বাভাবিকভাবেই ম্যাচটি ঘিরে দর্শকদের আগ্রহ ছিল তুঙ্গে। এই সুযোগেই ওল্ডহ্যামের ২৭ বছর বয়সী এক যুবক বেঞ্জামিন বেইলি টিকিট ছাড়াই স্টেডিয়ামে ঢোকার চেষ্টা করেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি গেটে দায়িত্বে থাকা নিরাপত্তাকর্মীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে টার্নস্টাইল পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতে সক্ষম হন। তবে তার এই প্রচেষ্টা বেশিক্ষণ গোপন থাকেনি। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা দ্রুত তাকে শনাক্ত করে আটক করেন এবং পরে পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
পরবর্তীতে তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি নিজের অপরাধ স্বীকার করেন। আদালত তার বিরুদ্ধে তিন বছরের জন্য সব ধরনের ফুটবল স্টেডিয়ামে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে এবং পাশাপাশি ২৩০ পাউন্ড জরিমানার নির্দেশ দেয়। এই রায়কে ইংল্যান্ডে টেইলগেটিংয়ের বিরুদ্ধে প্রথম কঠোর শাস্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
‘টেইলগেটিং’ বিষয়টি আসলে কী? স্টেডিয়ামে প্রবেশের জন্য সাধারণত টার্নস্টাইল বা স্বয়ংক্রিয় গেট ব্যবহার করা হয়, যেখানে একজন বৈধ টিকিটধারী প্রবেশ করলে গেটটি একবারই খোলে। কিন্তু টিকিটবিহীন কেউ যদি সেই বৈধ দর্শকের খুব কাছাকাছি থেকে দ্রুত ঢুকে পড়ে, তখন সেটিই টেইলগেটিং হিসেবে পরিচিত হয়। এতে এক ধরনের প্রতারণার মাধ্যমে নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পাশ কাটানো হয়।
ইংল্যান্ডে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। তবে আগে এ নিয়ে কঠোর কোনো আইন কার্যকর ছিল না। সাধারণত ধরা পড়লে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে স্টেডিয়াম থেকে বের করে দেওয়া হতো। কিন্তু ২০২১ সালে ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের সময় ঘটে যাওয়া বিশৃঙ্খলার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সেই ম্যাচে বিপুলসংখ্যক টিকিটবিহীন সমর্থক নিরাপত্তা ভেঙে ওয়েম্বলিতে ঢুকে পড়েন, যা বড় ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করেছিল।
একটি তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ওই দিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছিল এবং প্রাণহানির আশঙ্কাও ছিল প্রবল। হাজারের বেশি মানুষ অবৈধভাবে স্টেডিয়ামে ঢুকেছিল এবং জরুরি বহির্গমন পথও বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। এই ঘটনার পরই ব্রিটিশ সরকার নতুন আইন প্রণয়ন করে, যেখানে অননুমোদিতভাবে মাঠে প্রবেশকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
নতুন আইনের আওতায় এখন সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের নিষেধাজ্ঞা এবং এক হাজার পাউন্ড পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, আগে এসব ঘটনায় জালিয়াতির অভিযোগ আনা হলেও তা প্রমাণ করা কঠিন ছিল। কিন্তু নতুন আইন কার্যকর হওয়ায় এখন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে।
আসন্ন বড় ম্যাচগুলো যেমন এফএ কাপ ফাইনাল বা ভবিষ্যতের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ এই আইনের কার্যকারিতা আরও স্পষ্ট করে তুলবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। স্টেডিয়াম কর্তৃপক্ষের মতে, টেইলগেটিং শুধু নিয়ম ভঙ্গই নয়, এটি নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এতে অতিরিক্ত ভিড় তৈরি হয়ে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ে এবং প্রকৃত টিকিটধারী দর্শকেরাও বিপদের মুখে পড়তে পারেন।
সব মিলিয়ে, বেঞ্জামিন বেইলির শাস্তি একটি সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, এই কঠোর অবস্থানের ফলে ভবিষ্যতে টেইলগেটিং কতটা কমে এবং স্টেডিয়ামের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।
সোর্স: প্রথম আলো


